কেমন মৃত্যুর মতো পাশে পরে আছো, সিনেমা…

“কেমন মৃত্যুর মতো পাশে পড়ে আছো, কবিতা…”

এটি “মাটির প্রজার দেশে” চলচ্চিত্রের একমাত্র গানের প্রথম পংক্তি। লিখেছেন সাত্যকি ব্যানার্জী। গানটি আমি বেশ ক’বার টানা শুনছি। কেমন যেনো এক ধরনের হাহাকার সৃষ্টি হয়।  সে হাহাকার আমাকে আমার জীবন বাস্তবতায় যেমন নিয়ে যায়, তেমনি করে নিজেকে চলচ্চিত্রের লোক ভাবি বলে হয়তো চলচ্চিত্রের যে আকাল চলছে সে আকালজনিত হাহাকারেও নিয়ে যায়। একটু একটু করে আমার চলচ্চিত্রমূখী যে যাত্রা, সে যাত্রায় বর্তমানে আমাকে সবচেয়ে বেশী বেদনা দিচ্ছে চলচ্চিত্র পরিবেশনা সিস্টেম। 

আসলে এদেশে পরিবেশনার কোন সিস্টেমই নেই। আছে একদল মুনাফা লোভী। যারা পরিবেশনার নামে ডাকাতি করার চিন্তায় থাকে। এই ডাকাত দলটি আস্তানা গেড়ে বসেছে কাকরাইলে। এক সেমিনারে ডাকাতির গল্পই শুনলাম যেনো। আপনি একটি সিনেমা যে করেই হোক বানিয়েছেন। এখন আপনাকে সিনেমাটি নিয়ে যেতে হবে দর্শকের কাছে। দর্শক চিনে সিনেমা হল। তো সিনেমা যাবে হলে। আর ডাকাতদের সাথেই হল মালিকদের সখ্য। সুতরাং হল মালিকদের কাছে যেতে আপনাকে ডাকাতদের পাড়ায় যেতেই হবে। তখন আপনাকে ডাকাতেরা জিজ্ঞেস করবে, গান কয়টা আছে? ঢিসিম ঢিসিম কয়টা? নায়ক কে? নায়িকা কে? নায়িকার ইয়ে দেখা যায়? এসবের উত্তরে সে মনোপুত না হলে আপনার সিনেমার জনরার নাম সে দিয়ে দিবে আর্ট ফিল্ম। আর্ট ফিল্ম এদেশে চলেনা বলে ফিরিয়ে দিবে। দু’চারটা নাক সিটকানো মন্তব্যও ফ্রিতে শুনবেন। আবার কেউ কেউ সিনেমাটি নিতে চাইবে, বিনিময়ে সে সিনেমার প্রযোজনা সত্ত্ব চেয়ে বসবে। তখন আর কি করা? আপনি আপনার সিনেমা নিয়ে বাড়ি চলে আসবেন। বাড়ি এসে সিনেমার দিকে তাকিয়ে গাইবেন,

“কেমন মৃত্যুর মতো পাশে পরে আছো, সিনেমা…”

গল্পটা এমনই হবার কথা। এমনই হয়েছে ইতোপূর্বে কিংবা সর্বস্ব বেচে দিয়েছেন ডাকাতদের কাছে। বেচে দেওয়ার গল্পই আসলে বেশী। এখন সময়টাই বেচে দেওয়ার। চারিদিক যেভাবে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে সব, তখন বেচে দিয়ে মুক্ত হয়ে যাচ্ছে সকলে। যেন দায়মুক্তি। আর মুক্তি থেকেই শুরু হয় ভক্তির। পুড়ে যাওয়া সমাজে ভক্তিটা একটু বেশিই থাকে। ভক্তিতে বেশী বেশী যারা, তাদের আমরা অপ্রকাশ্যে আদর করে চোর বলি। অতএব পুরো ব্যবস্থাপনাতেই চোরের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। শুধুই কি সিনেমা? শিল্পের সকল রূপইতো কেমন মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমি বলব, মুখ থুবড়ে পড়তে দেয়া হয়েছে। না আছে গান, না আছে কবিতা, না আছে সিনেমা। কালে ভদ্রে যা হয় দু চারটা, সেগুলোকেও যেনো গলা টিপে মেরে ফেলার চেষ্টা। কে যেনো বলেছিলো বন যখন পুড়তে শুরু করে তখন কেবল নির্দিষ্ট একজাতের গাছ পুড়ে না, সব গাছই পুড়তে শুরু করে।

যাই হোক, একটা আশার কথা শোনাই। একটা সিনেমা রিলিজ হয়েছে আজ। নাম ‘মাটির প্রজার দেশে’। পরিচালকের নাম বিজন ইমতিয়াজ। আর সিনেমার প্রযোজক যিনি তাঁর নাম আরিফুর রহমান। আরিফুর রহমান ভয়াবহ এক ঘটনা ঘটিয়েছেন। উদ্দেশ্য সৎ থাকলে ইতিহাস তাকে ধনাত্নকভাবে মনে রাখবে। কাকরাইল পাড়ার যে গল্পগুলো বললাম তাঁর বাস্তবতার শিকার তিনি এবং তাঁর ছবিও। তিনিও বাড়ি চলে এসেছিলেন। এসে হয়ত গানটিও শুনেছেন।কিন্তু দমে যাননি। শুরু করেন নতুন লড়াই। যেহেতু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পেয়েছে এবং সেখানকার দর্শক ছবিটিকে স্বাগত জানিয়েছে, সেহেতু তার দেশের গল্পে নির্মিত ছবি, তার দেশের মানুষ, তার মত করে দেখবেনা- তা কি করে হয়? নেমে পড়লেন রাস্তায়। ঘুরে ঘুরে রাজি করিয়ে ফেললেন তিনটি সিনেমা হল। যুক্ত হলো নতুন পরিচয়। পরিবেশক। তাঁর মতে, ছোট্ট করেই শুরু। দর্শক যদি পছন্দ করে তবে হল সংখ্যা ৫টি-১০টি করে বেড়ে যেতে পারে। আত্মবিশ্বাস আছে তাঁর। ডাকাত পাড়াকে বুড়ো আঙ্গুল দেখায় এমন সাহস কোন এক অদ্ভুত কারণে এদেশের বুড়োদেরও হয়নি। আরিফুর রহমান সাহস করেছেন। কারণ সে নবীন। সে তরুণ। আমি বিশ্বাস করি, বুড়োদের দিয়ে এদেশে আর কিছু হবে না। তারা বরং গ্রামের বাড়িতেই চলে যাক।

এদেশে আসলে সত্যিকার অর্থে পরিবেশনা বলে কিছু নেই। পরিবেশকদের অনেক দায়িত্ব থাকে। তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম মার্কেটিং। যার ছিটেফোটাও তাঁরা করেনা। সব দায়িত্ব যেনো নির্মাণকারীদের। এরা শুধুই একটা মুনাফালোভী প্রকাশ্য ডাকাতদল। হাল আমলের ব্যাংক ডাকাতদের মতো একটি সিন্ডিকেট বানিয়ে বসে আছে। বুকিং এজেন্টদের যে দায়িত্ব থাকে সেটুকু পালন করেই এরা একটা সিনেমার সর্বস্ব লুট করার নিয়তে থাকে। হল মালিকদেরও এতেই সায়। সময় এসেছে এই সিন্ডিকেট গুড়িয়ে দেওয়ার। আরিফুর রহমানের মতো তরুণরাই করবে সেটা। আবারও বলছি, বুড়োদের দিয়ে কিছু হবেনা, যারা বিকল্প বিকল্প চিৎকার করেই গেলো; অথচ হলোনা কিছুই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *